নিজস্ব প্রতিনিধিঃ
বাংলাদেশজুড়ে মনিটরিংহীন পশু জবাই এখন এক নীরব জনস্বাস্থ্য সংকটে পরিণত হয়েছে। রাজধানী থেকে গ্রাম পর্যন্ত কোথাও নেই কার্যকর তদারকি, নেই ভেটেরিনারি পরীক্ষা, নেই স্বাস্থ্যবিধি। প্রতিদিন রাস্তার পাশে, বাজারের পেছনে, অস্থায়ীভাবে পশু জবাই করা হচ্ছে যা জনস্বাস্থ্যের জন্য বিপজ্জনক হয়ে উঠছে। বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করছেন—এই অনিয়মের ফলে দেশে অ্যানথ্রাক্সসহ মারাত্মক জুনোটিক রোগ ছড়িয়ে পড়তে পারে, যার প্রভাব হতে পারে দীর্ঘমেয়াদি।
সরকারি নীতিমালা অনুযায়ী, যেকোনো পশু জবাইয়ের আগে পশুর স্বাস্থ্য পরীক্ষা, নির্ধারিত জবাইখানায় জবাই, এবং যথাযথ বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। বাস্তবে দেশের অধিকাংশ জায়গায় এসব নিয়ম মানা হচ্ছে না। কসাইরা নিজের মতো করে পশু জবাই করছেন; কেউ কেউ হয়তো নিয়ম জানেন না, আবার কেউ ইচ্ছাকৃতভাবেই মানছেন না। স্থানীয় প্রশাসন ও পৌর কর্তৃপক্ষ বিষয়টি জেনেও কার্যত নীরব। ফলে দিন দিন বাড়ছে জনস্বাস্থ্য ঝুঁকি, বাড়ছে সংক্রমণের সম্ভাবনা।
অ্যানথ্রাক্স একটি ভয়াবহ ব্যাকটেরিয়াজনিত সংক্রামক রোগ, যা পশু থেকে মানুষের শরীরে ছড়িয়ে পড়ে। রোগটির সবচেয়ে সাধারণ ধরন চর্ম-অ্যানথ্রাক্স, যেখানে আক্রান্ত ব্যক্তির ত্বকে ফোঁড়া, ব্যথা ও সংক্রমণ দেখা দেয়। অনেক সময় এটি শ্বাসতন্ত্র ও পরিপাকতন্ত্রেও আক্রমণ করতে পারে—যা প্রাণঘাতী হয়ে উঠতে পারে। ইতোমধ্যে দেশের কিছু এলাকায়, যেমন পাবনা, সিরাজগঞ্জ, কুষ্টিয়া ও রাজশাহীতে অ্যানথ্রাক্সে আক্রান্ত রোগীর খবর পাওয়া গেছে। প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর ২০২৩ সালে দেশে অ্যানথ্রাক্সের ৪৫টি নিশ্চিত ঘটনার কথা স্বীকার করেছে, যার অধিকাংশই পশু জবাই-পরবর্তী সংক্রমণ।
সচেতনতা ও নজরদারির অভাব এতটাই যে, বেশিরভাগ পৌরসভায় জবাইখানা থাকলেও তা ব্যবহার হচ্ছে না। অনেক জবাইখানা বন্ধ হয়ে গেছে বা পরিত্যক্ত অবস্থায় আছে। ফলে কসাইরা খোলা জায়গায় পশু জবাই করছেন। এমনকি অনেক বাজারেই পশু জবাই হচ্ছে নর্দমার পাশে, যেখানে রক্ত ও বর্জ্য সরাসরি গিয়ে মিশছে খোলা ড্রেনে। এতে পানিবাহিত ও পরিবেশগত রোগেরও আশঙ্কা বাড়ছে। অনেক জায়গায় জবাই করা পশুর চামড়া যথাযথভাবে সংরক্ষিত না হওয়ায় চামড়াশিল্পেও ক্ষতি হচ্ছে।
সাধারণ মানুষ এসব অসুস্থ পশুর মাংস খাওয়ার মাধ্যমে অথবা জবাইয়ের সময় সংস্পর্শে এসে আক্রান্ত হচ্ছেন। চিকিৎসকেরা বলছেন, অনেক রোগী অ্যানথ্রাক্সের উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে আসেন, কিন্তু তারা রোগটির নামও জানেন না। ফলে সঠিক সময়ে চিকিৎসা না পাওয়ার ঝুঁকিও বাড়ছে। আবার, রোগের প্রকোপ বাড়লে তা মানুষের মধ্যে আতঙ্ক সৃষ্টি করে—যার প্রভাব পড়ে অর্থনীতিতেও, বিশেষ করে পশু খামার ও চামড়াশিল্পে।
কর্তৃপক্ষের ভূমিকা এখানে প্রশ্নবিদ্ধ। রাজধানীর দুই সিটি করপোরেশন, জেলা প্রশাসন, পৌরসভা এবং প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের মধ্যে নেই কার্যকর সমন্বয়। প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তারা বলছেন, জনবল ও লজিস্টিক সাপোর্টের অভাবে তারা নিয়মিত মনিটরিং করতে পারছেন না। অন্যদিকে স্থানীয় প্রশাসন রাজনৈতিক চাপ, স্বল্পবাজেট ও অগ্রাধিকারের অভাব দেখিয়ে দায় এড়িয়ে যাচ্ছে। এদিকে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরও কার্যকর হস্তক্ষেপ করতে পারছে না, কারণ পশু জবাই মূলত প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের আওতায় পড়ে।
সবমিলিয়ে, এই অনিয়ন্ত্রিত পশু জবাই ও নজরদারিহীনতা দেশের জন্য একটি স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তা সংকটে পরিণত হতে চলেছে। রোগ প্রতিরোধে যত না চিকিৎসা দরকার, তার চেয়ে বেশি দরকার প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা। এর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো—সারাদেশে পশু জবাই ব্যবস্থাকে নিয়মতান্ত্রিক করা, সচেতনতা তৈরি করা এবং দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠানগুলোকে সমন্বিতভাবে মাঠে নামানো।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এখনই সময় উদ্যোগ নেওয়ার। প্রতিটি উপজেলায় সক্রিয় ভেটেরিনারি সার্ভিস নিশ্চিত করা, কসাইদের প্রশিক্ষণ ও লাইসেন্স প্রদান, নির্দিষ্ট জবাই কেন্দ্র ব্যবহার বাধ্যতামূলক করা এবং জনসচেতনতা বাড়ানোর মাধ্যমে এ সংকট মোকাবিলা করা সম্ভব। না হলে অদূর ভবিষ্যতে এই সংকট ভয়াবহ স্বাস্থ্য বিপর্যয়ে রূপ নিতে পারে—যার খেসারত দিতে হবে পুরো জাতিকে।
এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।
© ২০২৬ একটি ই-প্রেস ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড প্রকাশনা ( গভঃ রেজিষ্টার্ড )