নিজস্ব প্রতিবেদকঃ
সিগারেটের দাম বাড়ার গুজব এবং জাতীয় বাজেটে তামাকজাত পণ্যের ওপর শুল্ক বৃদ্ধির সম্ভাবনার কারণে দেশের সব অঞ্চলে পাইকারি ও খুচরা পর্যায়ে সিগারেটের কৃত্রিম সংকট তৈরি হয়েছে। এতে সাধারণ ক্রেতা এবং খুচরা ব্যবসায়ীরা উভয়ই সমস্যার মুখে পড়েছেন। খুচরা ব্যবসায়ীরা অভিযোগ করছেন, কোম্পানি ও পাইকারি ডিলাররা মিলে সরবরাহ নিয়ন্ত্রণ করে বাজারে সিগারেট ছাড়ছেন না। তারা গোডাউনে পণ্য মজুত রাখছেন এবং বাজারে চাহিদা অনুযায়ী বিক্রি করছেন না। এর ফলে খুচরা ব্যবসায়ীরা বাধ্য হয়ে প্রতি শলাকায় কোম্পানির নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে ১–২ টাকা বেশি নিচ্ছেন, আর ক্রেতারা সীমিত পরিমাণেই সিগারেট পাচ্ছেন।
বৃহস্পতিবার (১১ জুন) বিভিন্ন খুচরা বাজার ঘুরে দেখা গেছে, হঠাৎ করে গত দুই দিন ধরে পাইকারি ব্যবসায়ীরা বিভিন্ন কোম্পানির সিগারেট প্রতি শলাকায় ১–২ টাকা বেশি দামে বিক্রি করছেন। খুচরা দোকানিরা বলছেন, সিন্ডিকেটের মাধ্যমে কোম্পানি ও ডিলাররা বাজারে সংকট তৈরি করেছেন। “কোম্পানি থেকে সরাসরি যে এজেন্টরা সিগারেট নেন, তারা গোডাউনে মজুত করে রেখেছে। খুচরা বাজারে চাহিদা অনুযায়ী পণ্য ছাড়ছেন না। পাইকারি ডিলাররা ইচ্ছা করেই দাম বাড়াচ্ছে,”—বলেন এক খুচরা ব্যবসায়ী।
পাইকারি ব্যবসায়ীরা জানান, আগে তারা প্রতিদিন ২০–২৫ কার্টুন করে সিগারেট সরবরাহ পেতেন, কিন্তু বর্তমানে দৈনিক সরবরাহ সীমিত হয়ে ৭–৮ কার্টুনে নেমে এসেছে। খুচরা ব্যবসায়ীরা বলেন, “আমরা সাধারণত প্রতিদিন ১৫–২০ কার্টুন বিক্রি করি। সরবরাহ কম থাকায় চাহিদা অনুযায়ী বিক্রি করা যাচ্ছে না। তাই খুচরা বাজারে প্রতি শলাকায় ১–২ টাকা বেশি নিতে বাধ্য হচ্ছি।”
বাজারে সিগারেটের দামও বেড়ে গেছে। খুচরা ব্যবসায়ীদের তথ্য অনুযায়ী, বিভিন্ন ব্র্যান্ডের দাম কোম্পানির নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে বেশি বিক্রি হচ্ছে। উদাহরণস্বরূপ, ব্যানসনের কোম্পানির মূল্য ৩৮০ টাকা হলেও বাজারে ৪০০ টাকা, গোল্ডলিফ ২৮০ থেকে ৩০০ টাকা, লাকি স্ট্রাইক ২১৬ থেকে ২২০ টাকা, নেভি ৮০ থেকে ৮৫ টাকা, স্টার ৮০ থেকে ৯৪ টাকা, রয়েল ৬৩ থেকে ৭০ টাকা এবং ডার্বি ৭২ থেকে ৭৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
খুচরা ব্যবসায়ীরা আরও জানিয়েছেন, আগে কোম্পানির ভ্যান সরাসরি দোকানে এসে অর্ডারের ভিত্তিতে সিগারেট সরবরাহ করত। কিন্তু দুই দিন ধরে সরাসরি সরবরাহ বন্ধ থাকায় তারা বাধ্য হয়ে পাইকারি বাজার থেকে পণ্য কিনছেন, যা তাদের জন্য অতিরিক্ত খরচের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এর ফলে দেশের সব অঞ্চলের ক্রেতারাও প্রভাবিত হচ্ছেন।
সিগারেটের দাম বাড়ার সম্ভাবনা নিয়ে ক্রেতাদের অসন্তোষও দেখা দিয়েছে। অনেক ধূমপায়ী বলেছেন, বাজেটের পর দাম বাড়বে তা সবাই জানে, মূল্য বৃদ্ধিতে সমস্যা নেই, তবে সিগারেটের মোড়কের গায়ে নির্ধারিত সর্বোচ্চ খুচরা মূল্য বাস্তবায়ন করতে হবে। তারা বলছেন, এর চেয়ে বেশি মূল্য দিয়ে ক্রয়ে তারা যেমন আর্থিক ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন, অপর দিকে সরকারেরও বিশাল অংকের রাজস্ব বঞ্চিত হচ্ছে। তারা মনে করছেন, এই পরিস্থিতিতে পাইকারি ডিলাররা লাভবান হচ্ছেন, আর সাধারণ ক্রেতারা অতিরিক্ত অর্থ খরচ করছেন।
খুচরা ব্যবসায়ীরা সরকারের তৎপর নজরদারি ও সর্বোচ্চ খুচরা মূল্য কার্যকর করার আহ্বান জানিয়েছেন। তারা বলেছেন, বাজারে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করে দামের গুজব ছড়ালে সাধারণ ক্রেতা এবং সরকার—উভয়ই ক্ষতির মুখে পড়বেন। তারা আশা করছেন, প্রশাসন দ্রুত পদক্ষেপ নেবে যেন সিন্ডিকেটের মাধ্যমে কৃত্রিম সংকট আর তৈরি না হয়।
দেশজুড়ে এই সংকটের কারণে খুচরা ব্যবসায়ীদের সঙ্গে সাধারণ ক্রেতারা একইসঙ্গে আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়ছেন। পাইকারি ও খুচরা ব্যবসায়ীরা বলছেন, সরবরাহ সীমিত করার কারণে দাম নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে এবং বাজারে সিগারেটের স্বাভাবিক চাহিদা মেটানো যাচ্ছে না। দেশের প্রতিটি শহর ও জেলার বাজারে একই পরিস্থিতি বিরাজ করছে। ক্রেতাদের কাছে যথাযথ সরবরাহ নিশ্চিত করতে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি।