মাসুদ লস্কর
বিএনপির মহাসচিব ও স্থানীয় সরকারমন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে রাষ্ট্রপতি পদে দলীয় প্রার্থী করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বিএনপি। বৃহস্পতিবার দুপুরের পর দলের চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে জ্যেষ্ঠ নেতাদের বৈঠকে এ সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত হয়েছে বলে দলীয় সূত্র জানিয়েছে। আজই নির্বাচন কমিশনে তাঁর মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার কথা রয়েছে।
সংসদে বিএনপির নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতার কারণে মির্জা ফখরুলের রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হওয়ার সম্ভাবনাই সবচেয়ে বেশি। ফলে তিনি নির্বাচিত হলে দেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব নিতে পারেন। একই সঙ্গে তাঁর বর্তমান তিনটি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব—বিএনপির মহাসচিব, জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য এবং স্থানীয় সরকারমন্ত্রীর পদ— নিয়ে নতুন করে সিদ্ধান্ত নিতে হবে দল ও সরকারকে।
মহাসচিব পদে কারা আলোচনায়
মির্জা ফখরুল প্রায় দেড় দশক ধরে বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে রয়েছেন। ২০১১ সালে তিনি দলের ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব হন এবং ২০১৬ সালের জাতীয় কাউন্সিলে আনুষ্ঠানিকভাবে মহাসচিব নির্বাচিত হন। দীর্ঘ রাজনৈতিক পথচলায় বিশেষ করে খালেদা জিয়ার কারাবন্দিত্ব ও তারেক রহমানের দীর্ঘ অনুপস্থিতির সময়ে তিনি বিএনপির সাংগঠনিক ও রাজনৈতিক নেতৃত্বের অন্যতম প্রধান মুখ ছিলেন।
বিএনপি সরকারের আমলে নয়, বরং আওয়ামী লীগ সরকারের দীর্ঘ সময়ে বিরোধী দলের কঠিন রাজনৈতিক পরিস্থিতিতেও তিনি দলের সামনে থেকে নেতৃত্ব দিয়েছেন এবং একাধিকবার কারাবরণ করেছেন। ফলে তাঁর উত্তরসূরি নির্বাচন বিএনপির জন্য শুধু সাংগঠনিক নয়, রাজনৈতিকভাবেও গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন দলটির নেতারা।
দলীয় অন্দরে সম্ভাব্য মহাসচিব হিসেবে সবচেয়ে বেশি আলোচনায় রয়েছেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ এবং দলের সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী। জুন মাসের একটি প্রতিবেদনে এই দুজনের পাশাপাশি আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর নামও সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে উঠে এসেছিল।
তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে সালাহউদ্দিন ও রিজভীর নামই বেশি আলোচনায় রয়েছে বলে দলীয় সূত্রের দাবি।
রিজভীর সামনে কেন সম্ভাবনা
রুহুল কবির রিজভী দীর্ঘদিন ধরে বিএনপির সাংগঠনিক ও প্রচার কার্যক্রমের অন্যতম দৃশ্যমান মুখ। বিরোধী দলের কঠিন সময়ে দলীয় কার্যালয়, সংবাদ সম্মেলন ও মাঠের রাজনৈতিক কর্মসূচিতে সক্রিয় থাকার কারণে দলের নেতাকর্মীদের মধ্যে তাঁর একটি শক্ত সাংগঠনিক ভিত্তি তৈরি হয়েছে।
রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের পরপরই যদি বিএনপি জাতীয় কাউন্সিল না করে, তাহলে সাময়িকভাবে ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব নিয়োগের সম্ভাবনাও রয়েছে। এ ক্ষেত্রে নির্বাচনী রাজনীতিতে সরাসরি না থাকা এবং দলীয় সাংগঠনিক কাজে দীর্ঘদিন সক্রিয় থাকার কারণে রিজভীকে দায়িত্ব দেওয়ার সম্ভাবনা নিয়ে দলের ভেতরে আলোচনা রয়েছে।
সালাহউদ্দিনের অবস্থানও শক্ত
অন্যদিকে সালাহউদ্দিন আহমদ বিএনপির নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের গুরুত্বপূর্ণ নেতা। দীর্ঘ রাজনৈতিক প্রতিকূলতার পর তিনি দলের কেন্দ্রীয় রাজনীতিতে আরও শক্ত অবস্থান তৈরি করেছেন। বর্তমানে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর দায়িত্বে থাকা এই নেতার নাম মির্জা ফখরুলের উত্তরসূরি হিসেবে আগে থেকেই আলোচনায় রয়েছে।
তবে তিনি মহাসচিব হলে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বও নতুন করে বণ্টনের প্রয়োজন হতে পারে। ফলে মির্জা ফখরুলের রাষ্ট্রপতি হওয়া বিএনপির পাশাপাশি সরকারেও একাধিক পদে পরিবর্তনের সুযোগ তৈরি করবে।
স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়েও পরিবর্তন
মির্জা ফখরুল রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হলে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বও নতুন কাউকে দিতে হবে। নতুন মন্ত্রী হিসেবে বর্তমান মন্ত্রিসভার কোনো সদস্যকে অতিরিক্ত দায়িত্ব দেওয়া হবে, নাকি নতুন কাউকে নিয়োগ দেওয়া হবে— এ বিষয়ে এখনো কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত জানা যায়নি।
রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হওয়ার পর মির্জা ফখরুলের ঠাকুরগাঁও-১ আসনও শূন্য হবে। সংবিধান অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি একই সঙ্গে সংসদ সদস্য থাকতে পারেন না। ফলে তাঁর আসনে পরবর্তী সময়ে উপনির্বাচনের প্রয়োজন হবে।
রাষ্ট্রপতি নির্বাচন ২০ আগস্ট
নির্বাচন কমিশনের ঘোষিত তফসিল অনুযায়ী, বৃহস্পতিবার বিকেল ৪টার মধ্যে রাষ্ট্রপতি পদে মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার সময় শেষ হবে। এরপর মনোনয়নপত্র যাচাই-বাছাই করা হবে। ১৮ আগস্ট মনোনয়ন প্রত্যাহারের শেষ দিন। একাধিক প্রার্থী বহাল থাকলে ২০ আগস্ট জাতীয় সংসদ ভবনে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে।
রাষ্ট্রপতি জনগণের সরাসরি ভোটে নির্বাচিত হন না; সংসদ সদস্যদের ভোটেই রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন। ফলে সংসদে যে দলের সংখ্যাগরিষ্ঠতা বেশি, সেই দলের প্রার্থীর জয় পাওয়ার সম্ভাবনাও বেশি।
এদিকে জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোটের পক্ষ থেকে লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির (এলডিপি) চেয়ারম্যান কর্নেল (অব.) অলি আহমদকে রাষ্ট্রপতি পদে প্রার্থী করা হয়েছে। ফলে শেষ পর্যন্ত একাধিক প্রার্থী থাকলে প্রায় ৩৫ বছর পর আবারও রাষ্ট্রপতি পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক ভোট হতে পারে।
শূন্য হয়েছে রাষ্ট্রপতির পদ
এর আগে গত ২৪ জুলাই রাষ্ট্রপতির পদ থেকে পদত্যাগ করেন মো. সাহাবুদ্দিন। তিনি জাতীয় সংসদের স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের কাছে সংবিধানের ৫০(৩) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী পদত্যাগপত্র জমা দেন। রাষ্ট্রপতির পদ শূন্য হওয়ার পর সংবিধান অনুযায়ী স্পিকার ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করছেন।
সাহাবুদ্দিন ছিলেন বাংলাদেশের ২২তম রাষ্ট্রপতি। ২০২৩ সালের ২৪ এপ্রিল তিনি রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন।
সংবিধান অনুযায়ী রাষ্ট্রপতির মেয়াদ পাঁচ বছর। তবে উত্তরসূরি দায়িত্ব গ্রহণ না করা পর্যন্ত বিদায়ী রাষ্ট্রপতি দায়িত্বে থাকতে পারেন। একই ব্যক্তি সর্বোচ্চ দুই মেয়াদ রাষ্ট্রপতি থাকতে পারেন।
রাষ্ট্রপতি পদে নির্বাচিত হওয়ার পর মির্জা ফখরুলকে দলীয় মহাসচিব ও মন্ত্রী পদ থেকে সরে দাঁড়াতে হবে। একই সঙ্গে সংসদ সদস্য হিসেবেও তাঁর আসন শূন্য হবে। ফলে তাঁর রাষ্ট্রপতি হওয়া শুধু রাষ্ট্রের শীর্ষ পদে পরিবর্তন নয়— একই সঙ্গে বিএনপির সাংগঠনিক নেতৃত্ব, মন্ত্রিসভা এবং ঠাকুরগাঁও-১ আসনেও নতুন সমীকরণ তৈরি করবে।
সব মিলিয়ে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের রাষ্ট্রপতি প্রার্থিতা চূড়ান্ত হলে পরবর্তী কয়েক সপ্তাহে বিএনপির সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক প্রশ্ন হয়ে দাঁড়াবে— দীর্ঘদিনের মহাসচিবের জায়গায় কে আসছেন, স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব কে পাচ্ছেন এবং ঠাকুরগাঁও-১ আসনের উপনির্বাচনে বিএনপির প্রার্থী কে হচ্ছেন।
এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।
© ২০২৬ একটি ই-প্রেস ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড প্রকাশনা ( গভঃ রেজিষ্টার্ড )