বিশেষ প্রতিনিধি, চট্টগ্রাম:
দক্ষিণ চট্টগ্রামের বাঁশখালী উপজেলার ৩নং খানখানাবাদ ইউনিয়নের রায়ছটা ৯নং ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সভাপতি, ফজলুল কাদের চৌধুরী-এক নামী ভুমি দস্যূ, যার অপরাধের ইতিহাস যেন এক সেলুলয়েড সিনেমার মতো রচিত হয়েছে। ভূমিদস্যু, চাঁদাবাজের সাথে সখ্যতা, চুরি এবং টেন্ডারবাজি—এসবই যেন তার চরিত্রের অবিচ্ছেদ্য অংশ। এসব অপরাধ সত্ত্বেও তিনি আজও ধরাছোঁয়ার বাইরে, যেন কোনো প্রাকৃতিক বা পারলৌকিক শক্তি তাকে রক্ষা করছে। এই অবস্থা এলাকার জনগণের জন্য এক অজানা আতঙ্কের জন্ম দিয়েছে, যেখানকার প্রশাসনও অবশেষে নীরব দর্শক হিসেবে দাঁড়িয়ে আছে।
ফজলুল কাদের চৌধুরীর আওয়ামী লীগের আমলে তার রাজনৈতিক অবস্থান ছিল আকাশচুম্বী। সেই ক্ষমতা ও অর্থের যুগ্ম প্রভাবে, তিনি একাধারে একাধিক অবৈধ কার্যকলাপের সঙ্গে যুক্ত হয়ে উঠেছিলেন। তার হাত ধরেই এই এলাকায় জমি দখলের মহাউৎসব শুরু হয়। সাধারণ মানুষের ভোগান্তি দিন দিন বেড়ে যাওয়ার পর, একদিন তার নিজের ভাগিনা আলমের সাথে জমি নিয়ে দ্বন্দ্বে জড়িয়ে পড়ে ফজলুল কাদের। এক পর্যায়ে আলমের মাথায় লোহার রড দিয়ে আঘাত করে, এবং গুরুতর আহত অবস্থায় তাকে হাসপাতালে নিতে হয়। এই ঘটনায় এলাকায় যে তোলপাড় সৃষ্টি হয়েছিল, তারপরও কিছুই হয়নি, কারণ প্রভাবশালী এই নেতার বিরুদ্ধে আইনের খড়গ কখনোই কার্যকরী হয়নি। তিন মাস জেল খেটে বেরিয়ে আসার পরেও তার অপরাধের সঙ্গীই সে; যেন কোনো কিছুই তাকে দমাতে পারে না।
ফজলুল কাদেরের পুত্র, সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী—যিনি উক্ত ইউনিয়ন যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক পদপ্রার্থী ছিলেন, তার নামও নানা বিতর্কের মাঝে আটকে রয়েছে। সর্বাধুনিক প্রযুক্তি রেডিওলিংকের মাধ্যমে চট্টগ্রাম নগরীর বাকলিয়া এলাকায় রমরমা অবৈধ ভিও আইপি ব্যবসা করে দিনে লক্ষাধিক টাকা আয় করে অঘোষিত কোটিপতি বনে যান। এই গুরুতর অভিযোগে অভিযুক্ত হয়ে চট্টগ্রাম র্যাব-৭ এর হাতে গ্রেপ্তার হয়েছিল, তবে অর্থের জোরে কিছুদিনের মধ্যে জামিন পেয়ে বেরিয়ে আসে।
এই পরিবারের অন্য সদস্য, আরিফ বিন কাদের চৌধুরী স্বর্ণ ও হুন্ডি ব্যবসা করে শতকোটি টাকার মালিক বনে যায়। তার আয়বহির্ভূত সম্পদের বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশন একটি মামলা করেন। তারপর সে পালিয়ে জার্মান চলে যান। সে দুদকের দুর্নীতি মামলায় ১৭ বছরের সাজা ও ৫০ লক্ষ টাকা অর্থদন্ডের আসামি ও নারী নির্যাতনের অভিযোগে অভিযুক্ত।
এখানেই শেষ নয়, ফজলুল কাদেরের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড যেন এক বিশাল জাল বিস্তার করেছে এই এলাকায়। তার হাতে স্থানীয়রা ঘর-বাড়ি হারিয়েছে, জীবিকা হারিয়েছে, আর সে নিজে ও তার দুই পুত্র ক্ষমতার শিখরে পৌছেছে। নানা ধরণের অবৈধ ব্যবসা, ভূমি দখল, ধর্ষণ, ভীতি সৃষ্টি—সবই তারা পিতা-পুত্র’র ‘ব্যবসা’। অথচ, প্রশাসন, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, এমনকি স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরাও নিস্তব্ধ, যেন সব কিছুই তাদের কাছে অদৃশ্য।
এদিকে, প্রশাসন ও সরকারের অভিযান “অপারেশন ডেভিল হান্ট”-এ যে আশা তৈরি হয়েছিল, তা আজ পর্যন্ত খানখানাবাদ ইউনিয়নের এ নেতাদের প্রতি কোনো প্রভাব ফেলতে পারেনি। এখানকার জনগণ প্রশ্ন তুলছে— কত টাকার বিনিময়ে এসব দস্যূরা এখনও প্রকাশ্যে এলাকায় ঘুরে বেড়াচ্ছে, এমনকি নিজেদের কার্যক্রমের নড়চড়ও করছে না। যেখানে সাধারণ মানুষ প্রতিবাদ করার সাহস পর্যন্ত হারিয়ে ফেলেছে, সেখানে ‘বিশেষ ক্ষমতার’ অধিকারীরা অবাধে শাসন করছেন, আর তাদের বিরুদ্ধে কোনো প্রতিকার নেই।
এসব অপরাধী নেতাদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি স্থানীয় জনগণের মধ্যে তীব্র। আইন সবার জন্য সমান—এই নীতি যদি নিশ্চিত করা না যায়, তবে এলাকায় কখনোই শান্তি ফিরবে না।
রায়ছটা ৯নং ওয়ার্ডের এলাকাবাসী আজকের দিনে দাঁড়িয়ে প্রত্যাশা করে, প্রশাসন যেন একটি সুনির্দিষ্ট এবং কঠোর পদক্ষেপ নেবেন, যাতে আর কোনো দুর্নীতিপরায়ণ নেতা এলাকায় জেগে না থাকে, আর দেশের আইনের শাসন প্রতিষ্ঠিত হয়।
এই প্রসঙ্গে বাঁশখালী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সাইফুল হক সময়ের কণ্ঠস্বরকে জানিয়েছেন, অপারেশন ডেভিল হান্ট অত্যন্ত সফলভাবে চলমান রয়েছে। এই আওয়ামী লীগ নেতা, যিনি হয়তো বর্তমানে পলাতক রয়েছেন, তার অবস্থান দ্রুত চিহ্নিত করে শিগগিরই আইনের আওতায় আনা হবে। বাঁশখালী থানা এলাকার কোনো অপরাধী কখনোই অপরাধ করে পার পাবে না। আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় আমরা সবসময় কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করি এবং কেউ আইনের শাস্তি থেকে রেহাই পাবে না।