প্রধান প্রতিবেদক
প্রকৌশল উন্নয়নের পরিধি যত বিস্তৃত হয়, তার অন্তর্গত বাস্তবতাও তত জটিল হয়ে ওঠে। কাগজে যে প্রকল্প কেবল সংখ্যা, বরাদ্দ আর বিলের হিসাব মাঠে তা মানুষের জীবনযাত্রা বদলে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি। এই জটিল সমীকরণের কেন্দ্রে দাঁড়িয়ে আছেন মোঃ বেলাল হোসেন, একজন প্রধান প্রকৌশলী, যাকে ঘিরে যেমন আলোচনা, তেমনি রয়েছে দৃশ্যমান কাজের দীর্ঘ ছাপ।
কুড়িগ্রামের ফুলবাড়ীর মাটিতে বেড়ে ওঠা এই মানুষটির যাত্রা ছিল সংগ্রামের, কিন্তু লক্ষ্য ছিল স্পষ্ট। পারিবারিক সীমাবদ্ধতার ভেতর থেকেও মেধার ধারাকে শাণিত করে তিনি পৌঁছে যান রাজশাহী প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাঙ্গণে। সেখানে সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে প্রথম শ্রেণিতে প্রথম স্থান অর্জন তার পেশাগত জীবনের ভিত গড়ে দেওয়ার এক দৃঢ় ভিত্তি।
১৯৯২ সালে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরে যোগদানের মধ্য দিয়ে শুরু হয় তার দীর্ঘ কর্মজীবন। মাঠপর্যায়ে দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে তিনি যে অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করেছেন, তা তাকে গড়ে তুলেছে বাস্তবমুখী এক প্রশাসক হিসেবে। ঠাকুরগাঁওয়ে দায়িত্ব পালনকালে “শ্রেষ্ঠ উপজেলা প্রকৌশলী” হিসেবে স্বীকৃতি পাওয়া তার কাজের মান ও নিষ্ঠার একটি স্পষ্ট প্রতিফলন।
গাইবান্ধা ও নীলফামারিতে দায়িত্ব পালনকালে বিভিন্ন প্রভাবশালী মহলের চাপ উপেক্ষা করে কাজের মান বজায় রাখার যে দৃঢ়তা তিনি দেখিয়েছেন, তা তাকে সহকর্মীদের কাছে একজন সৎ ও আপসহীন কর্মকর্তা হিসেবে পরিচিত করেছে। তার এই অবস্থান কেবল প্রশাসনিক দৃঢ়তা নয়, বরং নৈতিক অবস্থানেরও প্রতিফলন।
পরবর্তীতে সদর দপ্তরে এসে তার কাজের পরিধি আরও বিস্তৃত হয়। ঘাঘট লেক উন্নয়ন, অসমাপ্ত ব্রিজ প্রকল্পের কাজ সম্পন্ন করা এবং আন্তর্জাতিক মানের ক্যাবল স্টেইড ব্রিজের পরিকল্পনা প্রক্রিয়ায় সম্পৃক্ততা এসব উদ্যোগ তাকে একজন দক্ষ প্রকল্প বাস্তবায়নকারী হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেছে। তার নেতৃত্বে কাজের গুণগত মান বজায় রাখা এবং সময়মতো প্রকল্প সম্পন্ন করার প্রবণতা দৃশ্যমানভাবে লক্ষ্য করা যায়।
তবে এই দীর্ঘ পথচলার মাঝেই তার বিরুদ্ধে বিভিন্ন অভিযোগও উত্থাপিত হয়েছে যার মধ্যে রয়েছে অস্বাভাবিক সম্পদ সঞ্চয়, প্রকল্প বাস্তবায়ন নিয়ে প্রশ্ন, নিয়োগ ও পদায়ন প্রক্রিয়ায় অনিয়মের অভিযোগ। এসব অভিযোগ নিঃসন্দেহে গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনার দাবি রাখে।
কিন্তু সংশ্লিষ্ট মহলের একটি অংশ মনে করে, কোনো কর্মকর্তার বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণের জন্য প্রয়োজন নিরপেক্ষ তদন্ত, তথ্যভিত্তিক বিশ্লেষণ এবং প্রমাণনির্ভর সিদ্ধান্ত। একজন কর্মকর্তার দীর্ঘ কর্মজীবনের অর্জনকে উপেক্ষা করে কেবল অভিযোগের ভিত্তিতে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো বাস্তবতার সঠিক প্রতিফলন নয়।
প্রকৌশল খাতের অভিজ্ঞদের মতে, স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর-এর মতো বৃহৎ প্রতিষ্ঠানে প্রকল্প বাস্তবায়ন, নিয়োগ কিংবা পদায়ন সবই বহুপদক্ষেপে সম্পন্ন হয়। ফলে কোনো অনিয়ম থাকলে তা প্রাতিষ্ঠানিকভাবে যাচাই হওয়াই যুক্তিযুক্ত পথ।
এক প্রশ্নের জবাবে মোঃ বেলাল হোসেন ই প্রেস নিউজ কে বলেন, “মাননীয় স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী মহোদয়ের সুস্পষ্ট নির্দেশনা রয়েছে, এলজিইডিকে একটি সম্পূর্ণ স্বচ্ছ, জবাবদিহিমূলক এবং জনমুখী প্রতিষ্ঠানে রূপান্তর করতে হবে। আমি সেই নির্দেশনা বাস্তবায়নে সর্বোচ্চ আন্তরিকতা, কঠোরতা এবং পেশাগত দায়বদ্ধতা নিয়ে কাজ করে যাচ্ছি। কোনো অনিয়ম, কোনো দুর্নীতি তা যত বড় প্রভাবশালীর সঙ্গেই জড়িত থাকুক না কেন তার বিরুদ্ধে শূন্য সহনশীলতার নীতি অনুসরণ করা হচ্ছে।”
স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, “এলজিইডি দেশের গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়নের মেরুদণ্ড। এখানে কোনো ধরনের অনিয়ম বা দুর্নীতির স্থান নেই। যারা দায়িত্বে আছেন, তাদের অবশ্যই স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা এবং গুণগত মান নিশ্চিত করতে হবে অন্যথায় কঠোর প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
মন্ত্রী আরও বলেন, “উন্নয়ন শুধু প্রকল্পের পরিমাণে নয়, তার গুণগত মানে প্রতিফলিত হতে হবে। জনগণের টাকার প্রতিটি পয়সার হিসাব জনগণকে দিতে হবে, এই নীতি থেকেই আমরা কোনো আপস করব না।”
অফিসে বেশিরভাগ সময় অনুপস্থিতি নিয়ে জানতে চাইলে প্রধান প্রকৌশলী জানান, দেশের ক্রান্তিলগ্নে নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর বেশ কিছু অসংগতি ও জটিলতা নিরসনের মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে জরুরি সিদ্ধান্তে উপনীত হতে প্রায়ই মন্ত্রণালয়ে যেতে হয় যা রুটিন ওয়ার্ক। তবে মন্ত্রণালয়ের কাজ সেরে তড়িঘড়ি করে অফিসে ফিরেই প্রয়োজনীয় ফাইল সচল করন এমনকি অতিরিক্ত সময় ডিউটি করে সকল কার্যক্রম নিয়মিত রাখতে চেষ্টা করি।