বিশেষ প্রতিনিধি
স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) অধীনস্থ Important Rural Infrastructure Development Project on Priority Basis-3 (IRIDP-03) বা আইআরআইডিপি-০৩ প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক মোহাম্মদ রুহুল আমিন খানের বিরুদ্ধে সরকারি অর্থ আত্মসাৎ, অবৈধ সম্পদ অর্জন ও মানিলন্ডারিংয়ের গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ, এলজিইডি, স্থানীয় সরকার বিভাগ ও স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয় রহস্যজনক নীরবতা পালন করছে, যা জনমনে প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।
অভিযোগের বিস্তারিত বিবরণ:
অভিযোগকারীরা দাবি করেন, রুহুল আমিন খান প্রকল্পের অর্থ আত্মসাৎ করে নিজের ও স্ত্রী পারভীন আক্তার শিউলীর নামে বিপুল সম্পদ গড়ে তুলেছেন। উল্লেখযোগ্য অভিযোগসমূহের মধ্যে রয়েছে:
গাড়ি ক্রয়ে কর ফাঁকি: গুলশানে ক্রয়কৃত একটি বিলাসবহুল গাড়ি (রেজিস্ট্রেশন নম্বর: ঢাকা মেট্রো-গ-৩২-০৬১৯, চেসিস নম্বর: NZT260-3184956, ইঞ্জিন নম্বর: INZF 108280)। দেখানো ক্রয়মূল্য ৩১,৬১,৯৩৮ টাকা হলেও প্রকৃত মূল্য গোপন করে কর ফাঁকির অভিযোগ রয়েছে। জাতীয় রাজস্ব বোর্ড বনাম মাহমুদুল হাসান মামলায় (আপিল নং ৯৮/২০১৭) উচ্চ আদালত গাড়ির প্রকৃত মূল্য গোপন করে কম মূল্যে রেজিস্ট্রেশন করাকে কর ফাঁকির আওতায় পড়েছে বলে রায় দিয়েছেন।
লালমাটিয়ায় ফ্ল্যাট: রাজধানীর লালমাটিয়ার বুলবুলিকা ভবনের ৫ম তলায় ৬,০০০ বর্গফুটের একটি ফ্ল্যাট ক্রয়মূল্য ৫ কোটি ৮০ লাখ টাকায় ক্রয় করেছেন বলে অভিযোগ।
বহুবিধ সম্পদ: গুলশান, বনানী, উত্তরা ও বরিশালসহ নিজ জেলায় স্ত্রীর নামে একাধিক ফ্ল্যাট, বাড়ি ও প্লট, কোটি কোটি টাকার সম্পদ রয়েছে বলে অভিযোগ। এসব সম্পদের উৎস ও বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
রুহুল আমিন খান দাবি করেছেন, সব সম্পদ বৈধ আয় থেকে অর্জিত। তবে দুর্নীতি দমন কমিশন বনাম আরিফ খান (আপিল নং ৭৮/২০১৮), দুর্নীতি দমন কমিশন বনাম মোহাম্মদ হোসেন (দুদক আপিল নং ৩২/২০১৫) এবং দুর্নীতি দমন কমিশন বনাম আব্দুর রশিদ (রিট পিটিশন নং ৯৮৪৫/২০১৮) মামলায় উচ্চ আদালত স্পষ্টভাবে রায় দিয়েছেন যে স্ত্রী, সন্তান বা আত্মীয়ের নামে রাখা সম্পদ যার উৎস ব্যাখ্যা করা না যায় তা অবৈধ সম্পদ হিসেবে গণ্য হবে এবং সম্পদের উৎস ব্যাখ্যার দায়িত্ব অভিযুক্তের ওপরই বর্তাবে।
বরিশাল ও পিরোজপুর বিভাগীয় প্রকল্পে ব্যাপক অনিয়ম:
এলজিইডির বরিশাল বিভাগের ১৭টি প্রকল্পে প্রায় ২,০০০ কোটি টাকা লোপাটের অভিযোগে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) মামলা দায়ের করেছে। ২০২৫ সালের ১৫ এপ্রিল বাসসের প্রতিবেদন অনুযায়ী, পিরোজপুরে এলজিইডির বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পে কাজ না করে ১ হাজার ৭৯ কোটি ৪ লাখ ৯৩ হাজার ৮৩৯ টাকা আত্মসাতের অভিযোগে দুদক আটটি মামলা দায়ের করেছে, যেখানে পিরোজপুর ২ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য, সাবেক প্রধান প্রকৌশলী, নির্বাহী প্রকৌশলী ও জেলা হিসাব রক্ষণ অফিসের কর্মকর্তাসহ ২৭ জনকে আসামি করা হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, রুহুল আমিন খান তদবির করে নিজের নাম অভিযোগ থেকে বাদ দিয়েছেন। এসব প্রকল্পে কাজ না করেই টাকা উত্তোলন, ঠিকাদারদের সঙ্গে যোগসাজশ ও জেলা হিসাব রক্ষণ অফিসের সম্পৃক্ততার অভিযোগ উঠেছে। এছাড়া দক্ষিণ অঞ্চলের অন্যান্য এলজিইডি প্রকল্পেও ঠিকাদারি সিন্ডিকেট গড়ে তুলে কোটি কোটি টাকা লোপাটের অভিযোগ রয়েছে।
এ ধরনের অভিযোগ নিম্নোক্ত আইনের আওতায় পড়ে:
দণ্ডবিধি ১৮৬০: ধারা ৪০৬ (বিশ্বাসভঙ্গ) অনুযায়ী অনধিক ৭ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড এবং অর্থদণ্ডে দণ্ডনীয়। ধারা ৪০৯ (পাবলিক সার্ভেন্টের বিশ্বাসভঙ্গ) অনুযায়ী যাবজ্জীবন বা অনধিক ১০ বছর সশ্রম কারাদণ্ড এবং অর্থদণ্ডে দণ্ডনীয়।
দুর্নীতি দমন কমিশন আইন ২০০৪: ধারা ৫(১) অনুযায়ী পাবলিক সার্ভেন্টের অনুচিত সুবিধা প্রদান বা কাউকে ক্ষতিগ্রস্ত করার উদ্দেশ্যে দুর্নীতি এবং ধারা ৫(২)(ক) অনুযায়ী সরকারি তহবিল বা সম্পত্তি আত্মসাৎ বা অপব্যবহার দুর্নীতির অপরাধ। ধারা ২৭(১) অনুযায়ী অবৈধ সম্পদ অর্জনে অনূর্ধ্ব ৭ বছর এবং অনূন্য ৩ বছর সশ্রম কারাদণ্ড এবং সম্পদ বাজেয়াপ্তি।
মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইন ২০১২ (২০১৫ সংশোধিত): ধারা ২(ত) অনুযায়ী অবৈধ উৎসের অর্থ বা সম্পত্তি স্থানান্তর, রূপান্তর বা হস্তান্তর করে উৎস গোপন করা মানি লন্ডারিং এবং ধারা ৪(১) অনুযায়ী শাস্তি অনধিক ১২ বছর এবং অনূন্য ৪ বছর সশ্রম কারাদণ্ড এবং অপরাধের সাথে সম্পৃক্ত সম্পত্তির দ্বিগুণ মূল্য বা ১০ লাখ টাকা জরিমানা।
আয়কর অধ্যাদেশ ১৯৮৪: ধারা ১৬৫ অনুযায়ী কর ফাঁকিতে অনধিক ৫ বছর এবং অনূন্য ৩ মাস সশ্রম কারাদণ্ড এবং অর্থদণ্ড।
মূল্য সংযোজন কর (ভ্যাট) আইন ১৯৯১: ধারা ৩৭ অনুযায়ী ভ্যাট ফাঁকিতে অনধিক ৬ মাস কারাদণ্ড এবং ফাঁকিকৃত করের সমপরিমাণ অর্থদণ্ড।
প্রাসঙ্গিক নজির (উচ্চ আদালতের রায়সমূহ):
অর্থ আত্মসাৎ ও অবৈধ সম্পদ সংক্রান্ত: বাংলাদেশ বনাম মতিউর রহমান (দুদক আপিল নং ১৫৪/২০১৯) মামলায় সরকারি কর্মকর্তা কর্তৃক টেন্ডার প্রক্রিয়ায় অনিয়ম করে নিজের বা অন্যের অবৈধ সুবিধা প্রদান দুর্নীতির অপরাধ বলে রায় হয়েছে। দুর্নীতি দমন কমিশন বনাম আরাফাত রহমান (আপিল নং ৮৭/২০১০) মামলায় সম্পদের উৎস ব্যাখ্যা করতে ব্যর্থতা দুর্নীতির প্রমাণ হিসেবে গণ্য হবে বলে রায় দেওয়া হয়। দুর্নীতি দমন কমিশন বনাম সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী (আপিল নং ৩৯/২০১৬) মামলায় সরকারি পদমর্যাদার সুযোগ নিয়ে অর্জিত অর্থের হিসাব দিতে ব্যর্থতা দণ্ডনীয় অপরাধ বলে গণ্য হয়েছে। দুর্নীতি দমন কমিশন বনাম জাহিদ হোসেন (আপিল নং ৪৫/২০১৯) মামলায় উচ্চ পদমর্যাদার সরকারি কর্মকর্তাদের দুর্নীতির ক্ষেত্রে কঠোর শাস্তি প্রদানের নির্দেশনা রয়েছে। দুর্নীতি দমন কমিশন বনাম ফারুক আহমেদ (আপিল নং ১১২/২০১৮) মামলায় অবৈধ সম্পদ রাষ্ট্রের পক্ষে বাজেয়াপ্ত করার বিধান রয়েছে।
অর্থ পাচার সংক্রান্ত: পানামা পেপার্স মামলা (রিট পিটিশন নং ৯০৭৬/২০১৬) মামলায় বিদেশে অর্থ পাচারের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট ও দুদক যৌথভাবে তদন্ত করবে বলে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংক বনাম সেলিম আজাদ (আপিল নং ১২৭/২০২০) মামলায় সরকারি প্রকল্পের অর্থ আত্মসাৎ করে বিদেশি ব্যাংকে স্থানান্তর করা মানি লন্ডারিং অপরাধ বলে রায় হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংক বনাম মাসুদ আহমেদ (আপিল নং ১৪৩/২০১৯) মামলায় বিদেশে অবৈধ সম্পদ রাখা মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইনের আওতায় শাস্তিযোগ্য অপরাধ বলে গণ্য হয়েছে।
কর্তৃপক্ষের নীরবতা ও জবাবদিহিতা:
অভিযোগের বিষয়ে এলজিইডির মহাপরিচালক, স্থানীয় সরকার বিভাগের সচিব কিংবা সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় থেকে কোনো তদন্ত কমিটি গঠন, বক্তব্য বা অব্যাহতির সিদ্ধান্ত হয়নি। আইনি বিশেষজ্ঞরা বলেন, দুর্নীতি দমন কমিশন আইনের ধারা ৫ অনুযায়ী এ ধরনের গুরুতর অভিযোগের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাকে প্রাথমিকভাবে দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দিয়ে নিরপেক্ষ তদন্তের ব্যবস্থা করা উচিত। দুর্নীতি দমন কমিশন বনাম সাবরিনা আহমেদ (আপিল নং ৭৩/২০২১) মামলায় জনস্বাস্থ্য সংকটকালে সরকারি কর্মকর্তার দুর্নীতি অতিরিক্ত গুরুতর অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হবে বলে উচ্চ আদালত রায় দিয়েছেন।
সচেতন মহলের দাবি:
বঙ্গবন্ধু প্রকৌশলী পরিষদ (বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেমোরিয়াল ট্রাস্ট কর্তৃক অনুমোদিত), প্রধান কার্যালয়: ৯৬, মাওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাষানী সড়ক, শাহবাগ, ঢাকা-১০০০ এর সদস্য এবং স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের প্রকল্প পরিচালক রুহুল আমিন খানের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলো গভীরভাবে তদন্তের দাবি জানিয়েছে। সংগঠনটির পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, সরকারি প্রকল্পের অর্থ জনগণের করের টাকা, যার অপব্যবহার কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। দুদকসহ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের উচিত অভিযোগের স্বচ্ছ, নিরপেক্ষ তদন্ত করে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া।
সরকারি প্রকল্পের অর্থ জনগণের সম্পদ। অভিযোগ যাচাই না করে উপেক্ষা করা দুর্নীতিকে উৎসাহিত করবে। দুদকসহ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের উচিত অভিযোগের স্বচ্ছ, নিরপেক্ষ তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া। এ প্রতিবেদন প্রকাশকালে অভিযুক্ত ও কর্তৃপক্ষের বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি। জনগণের প্রত্যাশা, সরকারি অর্থের অপব্যবহারের যেকোনো অভিযোগ গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করে স্বচ্ছ তদন্তের ব্যবস্থা করা হবে। রুহুল আমিন খানের বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগের যথাযথ তদন্ত না হলে এটি দুর্নীতিবাজদের আরো সাহসী করে তুলবে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে আহ্বান, দেরি না করে রুহুল আমিন খানের বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগের নিরপেক্ষ ও স্বচ্ছ তদন্তের ব্যবস্থা করুন। প্রয়োজনে দুর্নীতি দমন কমিশনের মাধ্যমে এই বিষয়ে যথাযথ ব্যবস্থা নিন। জনগণের করের টাকা রক্ষায় কর্তৃপক্ষের দায়বদ্ধতা প্রদর্শন করুন।