এক আইটি ইঞ্জিনিয়ারের ‘আলাদিনের চেরাগ’
বেতন লাখ ছাড়িয়ে, দাপটে তটস্থ শিক্ষক-কর্মচারি ও অভিভাবকরা
নিজস্ব প্রতিবেদক
পদবি আইটি ইঞ্জিনিয়ার হলেও কাজ করেন কেবল ডাটা এন্ট্রি অপারেটর হিসেবে। কিন্তু বেতন মাসে ১ লাখ ১৪ হাজার টাকারও বেশি, যা ওই প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকদের বেতনের চেয়েও কয়েকগুণ। ২০১৩ সালে নিয়োগ পাওয়া এই কর্মচারীর মাত্র এক দশকের ব্যবধানে অস্বাভাবিক বেতন বৃদ্ধি এবং প্রতিষ্ঠানের ওপর একচ্ছত্র আধিপত্য নিয়ে উঠেছে নানা প্রশ্ন। নন এমপিও একজন কর্মচারীর অস্বাভাবিক বেতন । তিনি হলেন মোস্তাফিজুর রহমান।
এই কর্মচারির বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশন ও পরিদর্শন ও নিরীক্ষা অধিদপ্তরের অভিযোগ দেয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন স্কুলটির একাধিক শিক্ষক।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, মোস্তাফিজ মনিপুরী উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রভাবশালী ব্যক্তিতে পরিণত হয়েছেন। দাপ্তরিক কাজে তাকে পাওয়া না গেলেও দিনের বড় একটি অংশ তাকে দেখা যায় স্থানীয় রাজনৈতিক নেতাদের কার্যালয়ে। অভিযোগ রয়েছে, রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে তিনি প্রতিষ্ঠানের ভেতরে ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেছেন।
২০১৩ সালে সাধারণ পদে নিয়োগ পাওয়ার পর খুব অল্প সময়ে মোস্তাফিজের বেতন ১ লাখ ১৪ হাজার টাকা ছাড়িয়ে যায়। একজন সাধারণ কারিগরি কর্মচারীর বেতন কীভাবে অনেক অভিজ্ঞ ও উচ্চশিক্ষিত শিক্ষককে ছাড়িয়ে গেল, তা নিয়ে প্রতিষ্ঠানের ভেতরেই চাপা ক্ষোভ বিরাজ করছে। সংশ্লিষ্টরা একে ‘অস্বাভাবিক’ এবং ‘বিধি-বহির্ভূত সুবিধা’ হিসেবে দেখছেন।
মোস্তাফিজের বিরুদ্ধে সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগ হলো শিক্ষকদের বদলি বাণিজ্য। প্রতিষ্ঠানের এক শাখা থেকে অন্য শাখায় শিক্ষকদের পছন্দমতো জায়গায় বদলি করিয়ে দিয়ে তিনি মোটা অঙ্কের টাকা হাতিয়ে নেন বলে ভুক্তভোগী শিক্ষকরা জানিয়েছেন। এছাড়া স্কুলের কম্পিউটার সামগ্রী ও ইলেকট্রনিক যন্ত্রপাতি কেনাকাটার ক্ষেত্রেও তার একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ রয়েছে। বাজারমূল্যের চেয়ে চড়া দামে নিম্নমানের সামগ্রী কিনে প্রতিষ্ঠানের ফান্ডের টাকা আত্মসাৎ করার অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক শিক্ষক ও অভিভাবক জানান, মোস্তাফিজকে কখনোই সময়মতো স্কুলে পাওয়া যায় না। ব্যক্তিগত ব্যবসা-বাণিজ্য সামলাতেই তিনি ব্যস্ত থাকেন। এমনকি তিনি যে নিয়মিত অফিস করেন না, তার দালিলিক প্রমাণও প্রতিবেদকের হাতে এসেছে। প্রতিষ্ঠানের ফান্ডের টাকা লুটপাটের পাশাপাশি তিনি অন্য কর্মচারীদেরও বিভিন্নভাবে হুমকি-ধমকি দিয়ে থাকেন।নাম প্রকাশ না করার শর্তে মনিপুরী স্কুলের একাধিক শিক্ষক ও কর্মচারী এই প্রতিবেদককে বলেন আমরা বছরে মাত্র একটি ইনক্রিমেন্ট পাই কিন্তু নন এমপিও ভুক্ত মোস্তাফিজ বছরে ৩/৪ টি ইনক্রিমেন্ট নেয় যা সম্পূর্ণ নিয়ম বহির্ভূত।
প্রতিষ্ঠানের সাবেক এক শুভাকাঙ্খী বলেন, “আমি ভেবেছিলাম তিনি প্রতিষ্ঠানের উন্নয়ন চান। কিন্তু পরে বুঝতে পারি, তার লক্ষ্য মূলত মজুমদার আমলের দুর্নীতিবাজ কর্মচারীদের মতো প্রতিষ্ঠানের টাকা লুট করা। যখনই আমি তার অপকর্মের প্রতিবাদ করি, তখনই তিনি আমার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হন।”
এছাড়া তার বিরুদ্ধে কম্পিউটার ল্যাবের রক্ষণাবেক্ষণের নামে প্রতি মাসে ভুয়া বিল তুলে অর্থ আত্মসাৎ,আইটি পদ ব্যবহার করে ডাটাবেজ ম্যানিপুলেশনের মাধ্যমে অন্য কর্মচারীদের নিয়োগে প্রভাব বিস্তার,নিজের দুর্নীতির প্রমাণ মুছতে গুরুত্বপূর্ণ নথিপত্র বা ডিজিটাল রেকর্ড নষ্ট করা,সরকারি বা প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব পে-স্কেল লঙ্ঘন করে বিশেষ সুবিধায় ইনক্রিমেন্ট গ্রহণের অভিযোগও রয়েছে।
বাউফলের এক নিম্নবিত্ত পরিবারে বেড়ে ওঠা মোস্তাফিজের জীবনযাত্রায় এখন বিলাসিতা দেখলে বুঝা যায় তার অনিয়ম ও দুর্নীতির মাধ্যমে কাড়ি কাড়ি টাকা কামানোর রহস্য। সাধারণ ডাটা এন্ট্রির কাজ জানা একজন ব্যক্তির এই অস্বাভাবিক প্রতিপত্তি এবং অনৈতিক সুবিধা লাভের নেপথ্যে প্রশাসনের কারা জড়িত, তা নিয়ে তদন্তের দাবি তুলেছেন অভিভাবকরা।
এই বিষয়ে কথা বলতে মোস্তাফিজুর রহমানের হটস এ্যপে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, এগুলো ভিত্তিহীন। স্কুলের একটি গ্রুপ আমার বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালাচ্ছে।